চাঁদ কি সত্যিই চলে যাবে পৃথিবীকে ছেড়ে
চাঁদ হচ্ছে মহাজাগতিক বস্তুগুলোর মধ্যে পৃথিবীর সবচেয়ে নিকটতম প্রতিবেশী। কিন্তু সেই চাঁদ প্রতিবছরই আমাদের পৃথিবীকে ছেড়ে একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছে। ফলে প্রতি বছরই বারছে পৃথিবীর সাথে চাঁদের এই দূরত্ব।
কতটুকু বারছে এ দূরত্ব?
অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের লুনার অ্যান্ড প্ল্যানেটারি ল্যাবরেটরির অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর বিষ্ণু রেড্ডি বলছেন, ‘‘বছরে আমাদের হাতের নখ যতটা বাড়ে, প্রত্যেক বছরে চাঁদ ঠিক ততটা দূরত্বই সরে যাচ্ছে পৃথিবী থেকে। সেই দূরত্বটা বছরে ৩.৭৮ সেন্টিমিটার বা ১.৪৮ ইঞ্চি।
কি অদ্ভুত সম্পর্ক মানব দেহের সাথে আমাদের এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের তাইনা? আস্তে আস্তে চাঁদ এগিয়ে যাচ্ছে সূর্যের আরও কাছাকাছি।
কি হবে যদি চাঁদ চলে যায় পৃথিবীর কাছ থেকে?
- ঘটবেনা চন্দ্র গ্রহণ ও সূর্য গ্রহণচাঁদ আছে বলেই তো পৃথিবীতে গ্রহণের খেলা চলে। ঘটে চন্দ্র গ্রহণ ও সূর্য গ্রহণ। যা আমরা উপভোগ করি পৃথিবীতে বসে। কিন্তু জানেন কি আগামী ৬৫ কোটি বছর পর পৃথিবী থেকে আর সে সব কিছুই দেখা যাবে না!অধ্যাপক রেড্ডির বলেন, আগামী ৬৫ কোটি বছর পর চাঁদ পৃথিবীর থেকে যে পরিমান দূরত্বে পৌঁছে যাবে, সেখান থেকে তার পক্ষে আর সূর্যের মুখ ঢাকা সম্ভব হবে না। চাঁদ যে সূর্যের মুখ ঢাকছে, অন্তত পৃথিবী থেকে তা আর দেখা যাবে না। পুরোপুরি বা আংশিক, কোনওটাই নয়।এর ফলে, পৃথিবীর নিজ অক্ষের চারপাশে ঘূর্ণনের উপর চাঁদের ‘খবরদারি’ কমে যাবে। কমে যাবে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি।২৪ ঘন্টার চেয়ে আমাদের পার্থিব দিন আরও বড় হয়ে যাবে।চাঁদ পৃথিবী থেকে দূরে চলে যাওয়ার ফলে আগামী ৬৫ কোটি বছর পর থেকে পার্থিব দিন হবে ২৭ ঘণ্টার! এখনকার চেয়ে ৩ ঘণ্টা বেশি। বছরে দিনের সংখ্যাও আর ৩৬৫ না থেকে তা ঝুপ করে কমে যাবে অনেকটাই।সময় গড়ানোর সাথে সাথে বেড়ে যাবে দিনের আয়ু।দিন দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে কাজ কিছুই হলোনা বলে আর আক্ষেপ করতে হবে না।বরং তখন বেলা যে কাটতেই চায় না বলে চরম অস্বস্তিময় দিন কাটাতে হবে।
2. জোয়ার ভাটায় প্রভাব
চাঁদের এ দূরে সরে যাওয়ার প্রভাব পরবে জোয়ার ভাটাতেও। কমে যাবে জোয়ার ভাটার জোর। ঢেকে যাবে কঠিন থেকে কঠিনতম ঘুটঘুটে অন্ধকারে।
3. সূর্য গ্রাস করে নিবে চাঁদকে
চাঁদ যদি পৃথিবী থেকে কেবল দূরে সরে সরে যেতেই থাকে তবে একদিন চাঁদ সূর্যের এত কাছাকাছি এগিয়ে যাবে যে এক দিন সূর্যের ভয়ঙ্কর গ্রাসে সমর্পণ করবে নিজেকে। সূর্যও গিলে ফেলবে আমাদের স্বপ্নময় আবেগী ছন্দে ভরা আদরের চাঁদকে।
এ যেন ৪০০ কোটি বছর ধরে সূর্যের মুখ ঢাকার যে বেয়াদবি করেছিল চাঁদ সেই বদলা নেওয়া। আমাদের নক্ষত্রমণ্ডলের রাজা সূর্য গিলে খাবে আমাদের প্রিয় চাঁদকে!
4. জন্মকালীন সময়ে চাঁদ ও পৃথিবীর দূরত্ব :---
আজ থেকে প্রায় সাড়ে ৪০০ কোটি বছর আগে জন্ম হয়েছিল আমাদের পৃথিবীর এবং এর আরও ৫০ কোটি বছর পর গড়ে উঠেছিল পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ চাঁদের।
সেসময় চাঁদ ও পৃথিবীর দূরত্ব ছিল বর্তমান সময় থেকে আরো অনেক কম। তখন এদের দূরত্ব ছিল মাত্র ২২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার বা ১৪ হাজার মাইল। যেখানে পৃথিবীর উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরুর দূরত্ব ১২ হাজার ৪৩০ মাইল।
অর্থাৎ চাঁদ ছিল তখন পৃথিবীর হৃদয়ের খুব কাছাকাছি। আর বর্তমানে সেই চাঁদ সরতে সরতে পৃথিবী থেকে চলে গিয়েছে ৪ লক্ষ ২ হাজার ৩৩৬ কিলোমিটার বা আড়াই লক্ষ মাইল দূরে। অর্থাৎ আগের চেয়ে প্রায় ১৮ গুণ বেশি দূরে।
5. চাঁদ দূর চলে যাচ্ছে বলে কমছে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সংখ্যা:-
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ধ্রুবজ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, মোট চার রকমের সূর্যগ্রহণ দেখা যায় পৃথিবীতে।
- পূর্ণগ্রাস
- খণ্ডগ্রাস
- বলয় গ্রাস
- সংকর গ্রাস গ্রহণ ।
এই চার ধরনের মধ্যে এখন পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ হয় মাত্র ২৮ শতাংশ। ৩৫ শতাংশ হয় খণ্ডগ্রাস, ৩২ শতাংশ বলয় গ্রাস। আর মাত্র ৫ শতাংশ হয় সংকর গ্রাস।
অথচ, ৪০০ কোটি বছর আগে যখন চাঁদ জন্মাল, তখন পূর্ণগ্রাস হত মোট সূর্যগ্রহণের ৫০ শতাংশেরও কিছু বেশি। কারণ, চাঁদ সেই সময় খুব কাছে ছিল পৃথিবীর। ফলে চাঁদের পক্ষে সূর্যের মুখ পুরোপুরি ঢেকে দেওয়ার কাজটা অনেক সহজ হয়ে যেত। তার ছায়াটা অনেক বেশি এলাকা জুড়ে পড়ত পৃথিবীর ওপর।
আর ৩০ কোটি বছর পর পূর্ণগ্রাসের হার কমে হবে ১০ শতাংশ। ৫০ কোটি বছর পর তা হবে মাত্র ২ শতাংশ। আর ৬৫ কোটি বছর পর পৃথিবী থেকে আর কোনও ধরনের গ্রহণই দেখা সম্ভব হবে না। গ্রহণের ‘সৌন্দর্য্য উপভোগ’ থেকে বঞ্চিত হবে আমাদের এই বসুধা।
6. চাঁদ সরে গেলে কেন দেখা যাবেনা সূর্য গ্রহণ:-
আমরা জানি পৃথিবী ও চাঁদের কক্ষপথ দুটোই কিন্তু পুরোপুরি বৃত্তাকার নয়। তা কিছুটা চ্যাপ্টা উপবৃত্তাকার। যার ফলে পৃথিবী থেকে চাঁদকে অনেকসময় সূর্যের চেয়ে অনেক বেশি বড় দেখা যায় যা সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে দিতে সক্ষম হয়। যার ফলে আমরা চাঁদের ছায়া পৃথিবীতে পড়তে দেখি।
আবার কোন কোন সময়ে সূর্যকে চাঁদের চেয়ে বড় দেখাযায়।
প্রতিবছর ২ বার করে যখন চাঁদ সূর্যের সামনে দিয়ে তার পথ অতিক্রম করে তখন চাঁদ, সূর্য ও পৃথিবী একই সরলরেখায় অবস্থান করে ফলে ঘটে বলয়গ্রাস সূর্য গ্রহণ। চাঁদ যদি সরে যায় তবে এই শৃংখলায় ব্যঘাত ঘটবে।
7. চাঁদের অভাবে দিন বড় হয়ে যাবে
সাড়ে ৪০০ কোটি বছর আগে যখন পৃথিবীর জন্ম হয় তখন পৃথিবীর দিন ছিল মাত্র ২৩ হাজার সেকেন্ড বা সাড়ে ৬ ঘণ্টার। ৩০০ কোটি বছর আগে পৃথিবীর আহ্নিক গতি যখন একটু কমল, তখন দিনের সময় বেড়ে হয় ৮ ঘণ্টা। ৬২ কোটি বছর আগে দিন ছিল ২২ ঘণ্টার। আজ সেটা দাঁড়িয়েছে ২৪ ঘণ্টাতে।
আগামী ৬৫ কোটি বছর পরে দিন হবে ২৭ ঘণ্টার। অর্থাৎ, সময় যত গড়াবে, এই দিনের দৈর্ঘ্য আরও বাড়তে থাকবে।
8. চাঁদের কাছে পৃথিবী ঋণী
চাঁদ আছে বলেই অনেক বেশি সময় ধরে দিনের আলো দেখতে পাচ্ছে পৃথিবী যা প্রাণ সৃষ্টি ও বিকাশে সহায়ক হয়েছে।
পৃথিবীর আহ্নিক গতির ফলে দিন বা রাত কোনটাই খুব বেশি ক্ষণের জন্য স্থায়ী হতে পারেনা। চাঁদ তার অভিকর্ষ বলের টানে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি ঠিক রেখেছে। কিন্তু যখন চাঁদ থাকবেনা তখন পৃথিবী তার গতির ভারসাম্য হারিয়ে তার নিজ অক্ষে স্থির থাকতে না পেরে দিকভ্রান্তের মত ঘুরে বেড়াবে। দেখাদেবে পৃথিবীর জোয়ার ভাটায় পরিবর্তন। ফলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বেড়ে হবে ৩ গুন বেশি।
চাঁদ সূর্যের আলোয় আলোকিত হলেেও চাঁদ সূর্যের চেয়ে ৪ ০০ ০০০ ভাগের ১ ভাগ উজ্জ্বল। এই উজ্জ্বলতায় পৃথিবীর মানুষ রাতের আকাশে বুনে স্বপ্ন।
কিন্তু চাঁদ না থাকলে বিদঘুটে অন্ধকার রাত্রিতে দূরের শুক্র গ্রহই হবে আমাদের নিকটতম উজ্জ্বল বস্তু। থাকবেনা রোমান্টিক রাতের অস্তিত্ব।
9. চাদেঁর দূরে যাওয়ার ফলে পৃথিবীবাসী আর কতবছর শেষ পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখতে পারবে?
অধ্যাপক বিষ্ণু রেড্ডির ভাষায়, ‘‘আজ থেকে আর ঠিক ৫৭ কোটি বছর পর শেষ বারের মতো পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে পৃথিবী থেকে। আর তারও ৮ কোটি বছর পর পৃথিবী থেকে দেখা যাবে সূর্যের শেষ সংকর গ্রাস।’’
10. চাঁদ কেন পৃথিবী থেকে দূরে চলে যাচ্ছে?
প্রতি বছরই চাঁদ পৃথিবীকে বিদায় সম্ভাষণ করতে করতে সরে যাচ্ছে। কিন্তু কেন এ বিচ্ছেদ?
আমরা জানি, বেরিকেন্দ্র নামে পরিচিত একটি সাধারণ অক্ষের সাপেক্ষে পৃথিবী এবং চাঁদের ঘূর্ণনের ফলে যে মহাকর্ষীয় আকর্ষণ এবং কেন্দ্রবিমুখী বল সৃষ্টি হয় তা পৃথিবীর জোয়ার ভাটা সৃষ্টির জন্য অনেকাংশে দায়ী।
অর্থাৎ,মহাকর্ষ শক্তির প্রভাবে চাঁদ ও পৃথিবী একে অপরকে আকর্ষণ করে। পৃথিবীর উপর চাঁদের এই আকর্ষণের প্রভাব এদের দূরত্বের ওপর নির্ভর করে।
পৃথিবীর যে পাশ চাঁদের দিকে থাকে সে পাশে চাঁদ থেকে দূরত্ব কম থাকায় আকর্ষণ বেশি থাকে, আর পৃথিবীর অপর পাশে চাঁদ থেকে দূরত্ব বেশি থাকায় আকর্ষণ কম থাকে। পৃথিবীর দুই প্রান্তে এই আকর্ষণের তারতম্যের কারণেই পৃথিবীর জ্যামিতিক আকৃতির কিছুটা পরিবর্তন ঘটে। একে “Tidal Bulges” বলে। ফলে জোয়ার-ভাটার সৃষ্টি হয়।
আর এ জোয়ার ভাটা সৃষ্টি হতে যে পরিমাণ শক্তি শোষিত হয় তার কারণে বেরিকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে পৃথিবী ও চাঁদের কক্ষপথে বিভব শক্তি কমে যায়। এবং চাঁদ ও পৃথিবীর কারণে মধ্যে প্রতি বছর ৩.৮ সেন্টিমিটার করে দূরত্ব বেড়ে যায়।
যেহেতু মহাকাশের ছোটবড় প্রতিটি বস্তুরই একটি নির্দিষ্ট মাধ্যাকর্ষণ শক্তি রয়েছে। যে বস্তুটির ভর যত বেশি তার মধ্যাকর্ষন শক্তিও ততো বেশি।
অর্থাৎ বেশি গ্র্যাভিটি= বেশি ভর।
সে হিসাবে চাঁদ,পৃথিবী ও সূর্য সবারই একটা নির্দিষ্ট আকর্ষণ শক্তি রয়েছে।
পৃথিবীর ভর অনুসারে এর হিল স্ফেয়ারের ব্যাসার্ধ ১.৫ মিলিয়ন কিলোমিটার হওয়ায় এই ১৫ লক্ষ কিলোমিটারের মধ্যে যত বস্তু আছে সেগুলো সূর্যের দ্বারা বেশি আকর্ষিত না হয়ে পৃথিবীর দ্বারা বেশি আকর্ষিত হবে কারন এই এলাকায় পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ টান বেশি শক্তিশালী।
কিন্তু যখন কোন বস্তু পৃথিবীর এই আকর্ষণ সীমানা অতিক্রম করবে তখন সেটা পৃথিবী থেকে সূর্যের মধ্যাকর্ষন শক্তি দ্বারা বেশি প্রভাবিত হয়ে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে শুরু করবে।
11. অনন্ত কাল ধরে কি চাঁদ ও পৃথিবীর এ দূরত্ব বাড়বে এবং কি হবে এ দুটি জ্যোতিষ্কের শেষ পরিনতি? :---
না, অনন্তকাল চাঁদ ও পৃথিবী কেবল একে অপর হতে দূরেই যেতে থাকবেনা। পৃথিবীতে জোয়ারভাটার উপর যতদিন পর্যন্ত চাঁদের প্রভাব সম্পূর্ণ প্রশমিত না হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত চাঁদ দূরে সরে যেতে থাকবে এবং যেদিন এ
প্রভাবের প্রশমন ঘটবে শুধুমাত্র সেদিনই চাঁদের কক্ষপথ স্থিরতা পাবে।
কিন্তু ততোদিনে এরা একে অপর হতে চলে যাবে অনেকদূর।




Leave a Comment